আফ্রিকায় ইবোলার আতঙ্ক, ভারতে কড়া নজরদারি শুরু — দিল্লি বিমানবন্দরে জারি জরুরি স্বাস্থ্য নির্দেশিকা
![]() |
| ইবোলা আতঙ্কে কতটা নিরাপদ পশ্চিমবঙ্গ |
বেঙ্গল ফোকাস: করোনা মহামারির ভয়াবহ স্মৃতি এখনও পুরোপুরি মুছে যায়নি। তার মধ্যেই আবার নতুন করে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাস (Ebola Virus)। আফ্রিকার একাধিক দেশে হঠাৎ করেই ইবোলার সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় সতর্ক হয়েছে ভারত সরকারও। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে দিল্লির **ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (IGI Airport)** বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি করেছে।
কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রকের অধীনস্থ **ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ হেলথ সার্ভিসেস (DGHS)** বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা WHO-র সাম্প্রতিক রিপোর্ট খতিয়ে দেখেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো (DRC), উগান্ডা এবং দক্ষিণ সুদান এই তিন দেশকে বর্তমানে ইবোলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিমানবন্দরে বাড়ানো হচ্ছে নজরদারি
নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, এই দেশগুলি থেকে সরাসরি বা ট্রানজিট হয়ে ভারতে আসা যাত্রীদের ওপর বিশেষ স্বাস্থ্য পরীক্ষা চালানো হবে। কোনও যাত্রীর শরীরে ইবোলার উপসর্গ দেখা গেলে বিমানবন্দর ছাড়ার আগেই তাঁকে স্বাস্থ্য আধিকারিকদের কাছে রিপোর্ট করতে হবে।
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলিতে এখন ট্রাভেল হিস্ট্রি, শারীরিক অবস্থা এবং সম্ভাব্য সংক্রমণের দিকগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আগাম সতর্কতাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
কেন এত উদ্বেগ?
আফ্রিকার পরিস্থিতি ক্রমশ চিন্তার কারণ হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, শুধু কঙ্গোতেই কয়েকশো সন্দেহভাজন ইবোলা আক্রান্তের সন্ধান মিলেছে এবং বহু মানুষের মৃত্যুর খবরও সামনে এসেছে। যদিও সব মৃত্যুই ইবোলার কারণে হয়েছে কি না, তা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়, তবুও আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইতিমধ্যেই কয়েকটি দেশ কঙ্গো ও উগান্ডা থেকে আসা যাত্রীদের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি শুরু করেছে। ভারতও সেই পথেই হাঁটছে।
ইবোলা ভাইরাস কী?
ইবোলা অত্যন্ত মারাত্মক ও প্রাণঘাতী ভাইরাসঘটিত রোগ। এই রোগের মৃত্যুহার অনেক ক্ষেত্রেই ভয়াবহ হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আফ্রিকার ফলখেকো বাদুড় এই ভাইরাসের অন্যতম প্রধান উৎস। আক্রান্ত বন্য প্রাণীর সংস্পর্শে এলে প্রথমে মানুষের শরীরে সংক্রমণ ছড়ায়। পরে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তরল পদার্থ— যেমন রক্ত, লালা, ঘাম, বমি বা মলমূত্রের সংস্পর্শে এলে অন্যরাও আক্রান্ত হতে পারেন।
তবে চিকিৎসকদের বক্তব্য, ইবোলা সাধারণ সর্দি-কাশির মতো বাতাসে ছড়ায় না। তাই আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকাই সবচেয়ে জরুরি।
কোন লক্ষণ দেখলে সতর্ক হবেন?
স্বাস্থ্য দপ্তরের নির্দেশিকা অনুযায়ী, নিচের উপসর্গগুলিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে—
* হঠাৎ তীব্র জ্বর
* অতিরিক্ত দুর্বলতা ও ক্লান্তি
* পেশিতে ব্যথা ও মাথাব্যথা
* গলা ব্যথা
* বমি বা ডায়েরিয়া
* শরীরের ভেতর বা বাইরে অস্বাভাবিক রক্তপাত
বিশেষ করে যাঁরা সম্প্রতি আফ্রিকার ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে গিয়েছেন বা সেখান থেকে ফিরেছেন, তাঁদের মধ্যে এই উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
২১ দিন পর্যন্ত নজরদারিতে থাকার পরামর্শ
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ইবোলার উপসর্গ অনেক সময় সংক্রমণের কয়েকদিন পর দেখা দিতে পারে। তাই বিদেশ থেকে ফেরার পর অন্তত ২১ দিন নিজের শারীরিক অবস্থার ওপর নজর রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কোনও সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসককে অবশ্যই নিজের বিদেশ ভ্রমণের ইতিহাস জানাতে হবে।
কলকাতাও কি ঝুঁকিতে?
দিল্লিতে সতর্কতা জারি হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে কলকাতা কতটা নিরাপদ। যদিও কলকাতায় আফ্রিকা থেকে সরাসরি বিমান আসে না, তবে দিল্লি, মুম্বই, দুবাই বা দোহার মতো আন্তর্জাতিক হাব হয়ে বহু যাত্রী কলকাতায় পৌঁছন। সেই কারণেই চিকিৎসকমহলের একাংশ মনে করছেন, শুধু দিল্লি নয়, কলকাতা বিমানবন্দরেও যাত্রীদের ট্রাভেল হিস্ট্রির ওপর কড়া নজর রাখা জরুরি।
আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা
এই মুহূর্তে ভারতে কোনও ইবোলা আক্রান্ত রোগীর খোঁজ মেলেনি। তাই এখনই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিমানবন্দরগুলিতে নজরদারি বৃদ্ধি, দ্রুত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং আগাম প্রস্তুতিই ভবিষ্যতে বড় বিপদ এড়াতে সাহায্য করতে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, গুজব নয়, সঠিক তথ্য এবং সচেতনতাই পারে মানুষকে নিরাপদ রাখতে।
